Wednesday, May 20, 2020

ধৌলাগিরি প্রদক্ষিণ বা এক কষ্টভ্রমণের ভ্রমালাপ।

 ধৌলাগিরি প্রদক্ষিণ বা এক কষ্টভ্রমণের ভ্রমালাপ।
।।১।।
বহুদিনের ইচ্ছা একটা ভ্রমনকাহিনী লিখব। বাঙ্গালীস্বভাবের বয়সধর্মে কবিতা লিখেছি, গদ্য লিখেছি, এখন একটা ভ্রমণ লিখব। বেশ গাইডবুক-গাইডবুক গন্ধ থাকবে তা’তে। পথের বিবরণ পড়ে মানসচক্ষে স্থান-কাল-পাত্র চলচ্চিত্রের মতো ফুটে উঠবে। পথের প্রতিটা পাথরের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যাবে পাঠকের।
ইচ্ছা ছিলই। উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাচ্ছিলাম না (মানে যে স্থানটিকে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলে দেব পাঠকের হাতে)। এইবার মধ্য নেপালে এক কূলীন পর্বত (আট হাজারী) ধৌলাগিরিকে পাক মেরে মনে হচ্ছে পেয়েছি সেই কাঙ্ক্ষিত সাত রাজার ধন। তাই… বসে পড়লুম কলম বাগিয়ে।
ঠিক এক মাস আগে, অক্টোবরের চার তারিখ (সন ১৯৯৫), দুর্গা একাদশীর বিকালে রক্সৌলগামী ট্রেনে যে তিনজন লোটাকম্বল, তাঁবু, উনুনাত্যাদি নিয়ে চড়ে বসেছিলাম, বেড়িয়েছিলাম ট্রেকিং অভিযানে, তাদের বয়স, মাপ, চিন্তা, অভিজ্ঞতা সবই অসম। শুধু সাম্য ছিল উদ্দেশ্য পূরণের তাগিদে।
প্রচন্ড বর্ষণের শেষে ট্রেন যথারীতি এক ঘন্টা লেটে স্টেশান ছাড়ল। পরের দিন বাঁধা গতে প্রায় চার ঘন্টা লেটে (লাট খেয়েও বলা যায়), গড়ানো বে্লায়, রক্সৌল পৌঁছোনো, আর টাঙ্গায় চড়ে সীমান্ত পেড়িয়ে প্রবেশ নেপালের শহর বীরগঞ্জে। ধুলো-ধুসর, মলীন ও একঘেয়ে এই শহর থেকে সেই সন্ধ্যাতেই বাস ধরে আমাদের পরের গন্তব্য পোখরা। মধ্য নেপালের প্রধান শহর।
বীরগঞ্জে বাসে উঠে বসে আছি। নেপালি পুলিশ উঠলো পরিদর্শনে। এতোদিন জেনে এসেছি, শুনে এসেছি, নেপাল থেকে বিদেশী জিনিস আনা বিপদের। এবার জানলাম, নিয়ে যাওয়াও বিপদ। ক্যামেরাগুলো নিয়ে সেখানেই একপ্রস্থ জবাবদিহি করতে হ’ল। এর পরের অভিজ্ঞতা আরো ভয়ের। পোখরার হোটেলে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একদল বাঙ্গালী পর্যটকের বাস থেকে চুরি হয়ে গেছে সেই সবে। ঘড়িতে তখন ভোর চারটে।
পোখরায় সারাটা দিন কাটলো ট্রেকিং এজেন্সি থেকে পোর্টার ঠিক করায়, আর খুচরো কিছু শীতের পোষাক কেনাকাটায়। পরেরদিনের গন্তব্য ৮০ কিমি পশ্চিমের ছোট্ট জনপদ বাগলুং। আমাদের হাঁটা পথের শুরু।  
পরিকল্পনায় বাস থেকে নেমে সেই বিকেলেই ঘন্টা আড়াই-তিন হেঁটে বেনী (মিয়াগদি বেনী - মিয়াগদি খোলা আর কালিগন্ডকির সঙ্গম ‘বেনী’) পৌঁছনোর কথা ছিল। কিন্তু পথের রসদ কেনাকাটায় সময়ের অনুমান মিললো না। অতএব রাত কাটলো বাগলুঙয়ের এক ছাপোষা (এই ছাপো = ছারপোকা?) সরাইখানায়।









।।২।।   
হাঁটা শুরু হ’ল লক্ষীপুজার সকালে। অলোকদার গায়ে সামান্য জ্বর। বাগলুং বাজার শেষ হ’তেই দিগন্তে ফুটে ওঠে ঝকঝকে ধৌলাগিরি শিখর। ক্ষেতের মধ্য দিয়ে পথ গেছে, তারপর আবার খানিক গ্রাম, হঠাৎ একটা বড়ো চৌবাচ্ছায় হাঁসেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। গ্রাম ছেড়ে বেড়োতেই শুরু হ’ল উৎরাই।
পথ গিয়ে নামে একদম কালীগন্ডকীর কোলে। পরের পথ সহজ ওঠা-নামায় কালীগন্ডকীর ধার ধরে পৌঁছে দেয় মিয়াগদি আর কালীগন্ডকীর সঙ্গম বেনীতে। মাত্রই চার ঘন্টার পথ হেঁটেছি। কিন্তু অলোকদার শরীর বুঝে বেনীতেই থাকা সাব্যস্ত হ’ল। টেন্টও পড়ল না। নিবাস হ’ল হোটেল ডলফিন।
রাতের খাওয়া দাওয়ার পর বারান্দায় বসে, বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর কালো মেঘের মধ্যে উঁকি মারা কোজাগরীর চাঁদ দেখলাম দু’ চোখ ভরে। বেনীর উচ্চতা মাত্রই সাড়ে আট’শ মিটার। কিন্তু তুষার পাহাড়দের নৈকট্যে রাতে লেপমুড়ি দিতে হ’ল।
পরদিন সকালের হাঁটা বাবিয়াচৌরের (বাবিয়া এক ধরনের পাহাড়ি ঘাস, দড়ি পাকানোর কাজে ব্যবহৃত) উদ্দেশে। মিয়াগদির বাম তীর ধরে সহজ রাস্তা। পথের বাঁকে ঘাড় ঘোরালে পিছনের পাহাড় উপত্যকা নদীর উপর দিয়ে সূর্যের মায়াবী আলো এসে পড়ে চোখের পাতায়। হঠাৎ সামনে থেকে এসে পড়ে লম্বা সাদা কাপড়ের পতাকা হাতে এক মিছিল। ঝটপট ছবি তুলেই অপ্রস্তুত হয়ে যাই মিছিলের প্রান্তে এক শবদেহ দেখে। অচেনা দেশাচার বোকা বানিয়ে যায়।
সিংলা হ’য়ে দুপুরবেলা তাতোপানিতে মিয়াগদির সেতুর সামনে এসে পৌঁছাই। নদীর ধারে রান্নার আয়োজন হয়। খাওয়া সেরে ফের হাঁটা। পরনে শর্টস আর গেঞ্জি মাত্র। তা’ও এতো কম উচ্চতার সূর্য প্রখর তাপ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেহের ওপর। ঘামে চান করে যাই কয়েক মিনিটে। পথে পেয়াড়া দেখে সৌরভ লাফিয়ে ওঠে, ‘বেলৌতি কতি ছ?’ সামান্য কিছু সব্জিও মেলে রাতের জন্য। বাবিয়াচৌরে ঢোকার মুখেই টেন্ট করা হ’ল গাছের তলায়।   
পরদিন সকালেও অলোকদার গায়ে জ্বর। গত তিনদিন ধরে সঙ্গে আনা ওষুধগুলো খেয়ে চলেছে। জ্বর বাড়ে নি কিন্তু কমেও নি। পূর্বসিদ্ধান্ত মতো ঠিক হ’ল একদিন বিশ্রাম দিয়ে দেখা হবে কি হয়। একটা মুরগা জুটে গেল গ্রাম থেকে। অর্থাৎ খাওয়াটাও জমিয়ে হবে। অলকদাকে নিয়ে গেলাম গ্রামের ডাক্তারখানায়। তিনি সিদ্ধান্তে এলেন ‘টাইফয়েড’। সেই মতো ওষুধও দিলেন। বারন হ’ল মাংস খাওয়া। সেই দুপুরটায় ঘন ঘন আলোচনা চলল যাত্রার ভবিষ্যৎ নিয়ে। অলোকদা একা ফিরবে, নাকি সবাই?
পাহাড়ে আমার অভিজ্ঞতা সীমিত। সৌরভের নেই। তাই নিয়ে এতো লম্বা ও দুরূহ একটা পথে যাওয়াটা কতখানি ঝুঁকির, সেটা আমি বুঝলেও সৌরভ বোঝে না। শেষবেলার দিকে জ্বরটা নেই দেখে সিদ্ধান্ত হয় অলোকদা এগোবে। সেরকম কিছু হ’লে সকলেই ফিরে আসব। তবে এটাও ঠিক হ’ল পুরো ব্যপারটাই হবে আগামী দুদিনে।
।।৩।।
পরেরদিন অল্প পথ। নদীর কোল ঘেঁষে ঘন্টা দুই-আড়াই হেঁটে ফেদিতে ডাংখোলার সেতুর তলায় টেন্ট ফেলা হ’ল। আকাশ মেঘলা। বাবিয়াচৌরে দু-রাতেই বৃষ্টি হয়েছিল। ভাবছিলাম বর্ষা বোধ করি হাওড়া স্টেশান থেকেই আমাদের পিছু নিয়েছে।
ফেদিতেই সহজ পথ শেষ হ’ল। পরদিন সকালে সেতু টপকেই শুরু হ’ল লম্বা ‘ধারাপানির চড়াই’। টানা সোয়া এক ঘন্টার হাঁটা পৌঁছে দিল ধারাপানি গ্রামে। বেশ কয়েকজনের বর্ননায় এ’ চড়াইকে ক্লান্তিকর বা কঠিন বলে জেনেও আমার কিন্তু তা মনে হয় নি। হয়তো সকালবেলায় পথ চলার উৎসাহেই। প্রথম পনেরো-কুড়ি মিনিটের রাস্তা বাদ দিলে পথ সহজ বলেই মনে হয়েছে বরং। ধারাপানির পরেও সহজ চড়াই পথ চলে যায় টাকুম-সিবাং হয়ে ফালাই গাঁও। আমরা অবশ্য সেদিনটা সিবাং-এই থেকে গেলাম।
ফেদিতেই গন্ডগোল দেখা দিচ্ছিল, সিবাং এসে দেখি আমার গায়ের তাপও বিপদসীমার ওপরে। সিবাং-এ টেন্ট হয় স্কুলের মাঠে। পাশেই এক জার্মান-অস্ট্রিয়ান দল তাঁবু পেতেছে। দশজন অভিযাত্রীর জন্য চারজন শেরপা ও একজন রাঁধুনিসহ তিরিশজন ভারবাহক। চেয়ার-টেবিল-তোষক এমনকি পেট্রোম্যাক্সের আলো কিছুরই অভাব নেই। রাতে সিবাং-এর লোকেরা ধলো সাহেবদের সম্বর্ধনা দিল। কালো সাহেবরা তাঁবুর ভিতর শুয়ে ঢোল-করতাল সহযোগে গান উপভোগ করেই সন্তুষ্ট রইলাম। সৌরভ অবশ্য ছবি তুলতে গিয়ে গলায় গাঁদাফুলের মালা পড়ে এল। আর পরদিন সকালে যাত্রা শুরুর সময় প্রায় আকাশ থেকে এসে একজন বেচে গেল কেজি দেড়েক ট্রাউট মাছ। 
সিবাং থেকে বেড়িয়ে আমাদের পথের দুটি ভরসা ভক্তিপ্রসাদ আর ধনবাহাদুরের পরামর্শে, ফালাইগাঁওয়ের পথে না গিয়ে সরাসরি ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে আলপথে নেমে চললাম ধারাখোলার তীরে। তলায় নেমেই অবশ্য ফের ওপরে ওঠা। আগের থেকে পথ সংকীর্ন আর বিপদসংকুলও। পাহাড়টাও যেন অন্যরকম। ধাপচাষের জমি, গাছপালা, গ্রামের বাড়ি, মানুষজন সবকিছু। সভ্যতা থেকে ক্রমে দূরে সরে যাওয়ার অনুভুতি মনকে গ্রাস করতে চায়। দূরে মেঘের আড়ালে কোন এক বরফচুড়া আর ডানদিকে অনেক নীচে মিয়াগদি খোলা এখন ক্ষীণ রুপোলি রেখা। বেলা গড়িয়ে দুপুর হ’ল আর আমরা পৌঁছলাম মুরি গ্রামে। গ্রামের মাথায় যেখানে তাঁবু ফেলা হ’ল সেখান থেকে বাঁয়ে গুর্জা হিমাল আর সোজা তাকালে ধৌলাগিরি। জর্মন-অস্ট্রিয়ান টিমটাও সেদিন মুরিতে।
দুপুরের মাছভাতে বাড়ি ছাড়ার পর সেদিনই প্রথম আমাদের বাঙ্গালিয়ানা উদযাপন। সন্ধ্যায় ফের একটা বিদেশী সম্বর্ধনা সভার আঁচ বা আওয়াজ ভেসে এল নীচ থেকে। অলোকদা এই তিনদিনে প্রায় সুস্থ। আমিও সামলেছি প্রাথমিক ধাক্কাটা। প্রতি সন্ধ্যাতেই তাঁবুতে মোমবাতি জ্বেলে অলোকদা আর সৌরভ দিনলপি লিখতে বসে। সঙ্গে মুড়ি, খুনশুটি আর আড্ডা। কখনো ভক্তিপ্রসাদ ধনবাহাদুরুও যোগ দেয়, গুনগুনিয়ে ওদের গান শোনায়। একটু বেসুর, একটু বেতাল বাংলা গানের পসরা সাজায় সৌরভরা।   
।।৪।।
পরের দিন ধোলাখোলা টপকানোর জন্য ফের নিচে নামতে হয়। রাস্তা ধসে গেছে। ধসের মধ্যে দিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন পায়ে চলা পথ। তাই ধরে হুড়মুড়িয়ে নেমে আসা। নদী টপকে গুর্জা হিমালকে এ’ যাত্রায় শেষবার দেখে নিয়ে পায়ে পায়ে চড়াই ভেঙ্গে টপকে যাই ছোট্টো গিরিপথ ঘোরবান ধারা। ওপারে একটু নেমেই একটা খড়কা (চড়াতে আনা গবাদি পশুদের চালা/ অস্থায়ী খাটাল)। মোষের দুধ মেলে, বড়ো বাটি ভর্তি নেপালি দশ টাকায়। আমি আর অলকদা তাই সেবা করি।
কিছুক্ষনের মধ্যেই নওড়া হয়ে পৌঁছ যাই আপার যুগাপানিতে। আজ এখানেই দ্বিপ্রাহরিক ভোজন। বেশ গায়ে লাগার মতো রোদ। সামান্য জ্বর থাকায় আমার বুঝি একটু বেশিই লাগে রোদটা।
খাওয়ার পর শুরু হয় চড়াই ভাঙ্গা। আমার হিসেবে যাত্রাপথের দীর্ঘ এবং কঠিনতম। চারঘন্টার হাঁফ ধরানো সংকীর্ণ, বড়ো বড়ো ঘাসে ঢাকা পাথুরে পথের চড়াই। ডানদিকের খাড়া গড়ান সিধে নেমে গেছে মিয়াগদির বুকে আর বাঁয়ে খাড়া পর্বতগাত্র। গাছ প্রায় নেই। তবে বিরামহীন, নিষ্করুণ রোদ আছে প্রতিক্ষণ এই চার ঘন্টার পথ চলায়। একসময় সে চড়াইও শেষ হয়। পাহাড়ের ওপর থেকে অনেক তলায় দেখা যায় মিয়াগদির উদাস পথ চলায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে এক শুভ্রফেন সুন্দরী ঝর্না। পড়ন্ত বেলায় ছায়ার নিচে ঘোমটা টানে অচেনা পথিককে দেখে। একই রকম পথে বেশ খানিকটা নেমে এসে নজরে পড়ে বোঘারা গ্রাম। এ’ পথের শেষ গ্রাম।
আমাদের আগেই বিদেশীদের দলটা এসে গেছে। স্কুলের মাঠে তাদের শিবির সাজানো। দেখলেই সেই রাজা-রাজরাদের শিকার অভিযানের গল্প মনে পড়ে।  স্থান অকুলান। অগত্যা গ্রামের মাস্টারমশাইয়ের ব্যাবস্থায় তাঁবু পাতা হয় স্কুল মাঠের দু ধাপ ওপরে এক বাড়ির উঠোনে। অন্ধকার ঘনালে নিচের মাঠ আলোকিত আর হ্যাঁ, আবারও সংগীত-বাদ্যে মুখর হয়ে ওঠে। তাঁবুর ভিতর গা এলিয়ে আগামী দিনগুলোর চলার হিসাব কষি।            
পরেরদিনের গন্তব্য দোবাং। বোঘারা ছাড়ার সময় ফিরে দেখি ছোটো নেহাত অকিঞ্চিতকর কটা ঘর-বাড়ির দিকে। তরতরিয়ে নেমে যাই। অলোকদা ভক্তি আর ধনবাহাদুরের সঙ্গে এগিয়ে গেছে। হঠাত এক খরস্রোতা ঝরনা। ওপরের নড়বরে কাঠের সেতুটা পারাপারযোগ্য মনে হয় না। অনেক কসরত করে, জুতো না ভিজিয়ে ঝরনা টপকে ওপরে উঠি। পৌঁছই ছোট্ট বসতি জিয়ারদাংএ। অলোকদা আমাদের খোঁজে ছোটাছুটি ফেলে দিয়েছে প্রায়। জানলাম ভুল পথে চলে গেছিলাম।
সামান্য চড়াই ভাঙলেই আবার উতরাই পথ। জঙ্গলে ঢোকার মুখে রীতিমত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে সে রাস্তা। ধীরে ধীরে নেমে আসি। গভীর জঙ্গল। একাই পথ হাঁটছি। বাকিদের সাড়াশব্দ নেই। চিন্তা হচ্ছিল আবার পথ হারিয়েছি কিনা। উলটোদিক থেকে জনা তিন-চার মানুষকে আসতে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। এক সুউচ্চ জলপ্রপাত পেড়িয়ে পেলাম সৌরভ আর অলোকদাকে। সেখানেই দুপুরের খাওয়া-দাওয়া। সামনের পথও জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। ভিজে ছায়ায় মনের সুখে হাঁটি। মাঝে-মাঝে পথের ওপর দিয়ে বয়ে যায় জল। তার মধ্যেই পথ করে নিতে হয়। কাদা মাড়িয়ে হেঁটে চলি। পথে অনেক খরকা। কোনোটা অল্প জায়গায়, বনের খাঁজে। কোনোটা প্রসস্ত সমতলে। বেলা শেষে পৌঁছই দোবাং। জঙ্গলের মধ্যে এক মনোরম ক্যাম্পসাইট। অলোকদা হাতে গরম স্যুপের কাপটা দিতেই আরামের চুমুক দিই।
।।৫।।
ঠান্ডার দাপট ক্রমশঃ বাড়ছে।  পরদিন সকালে আবার হাঁটা শুরু হয় এক গোলমেলে উতরাই ধরে। ফের চড়াই, ফের উতরাই। তলায় নেমেই কাঠের পাটার ওপর দিয়ে কোনাবন খোলা টপকে, জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দ্রুত পথ চলি। আবার কাঠের সেতু। মিয়াগদির ওপর এবং বেশ বিপজ্জনক। আরেকটু এগিয়ে পাকাইট খোলা। ওপরে উঠলে চারতারে। দেখা হয় বেস ক্যাম্প থেকে নেমে আসা চার জর্মন অভিযাত্রীর সঙ্গে। বিশাল শরীরের মানুষগুলোর কাঁধের স্যাক বিশালকেও হার মানায়। পথের নির্দেশ নিই তাদের থেকে। চলতে থাকি। পাকাইট খোলার তীরে বসে চা বিস্কুট খেয়ে ফের চলা শুরু হয়। খানিক গিয়েই ভুঙ্গিনী। চোরিবন খোলার তীর জুড়ে ততক্ষনে আমাদের সঙ্গী জর্মন দল তাঁবু, থুড়ি, শিবির পেতেছে। আবার সেই ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’। অগত্যা এগোতে হয়।
এতো বড়ো ট্রেক। অর্ডার দিয়ে আমি আর সৌরভ জুতো বানিয়েছিলাম। চামড়ার জুতো। যেমন শক্ত-পোক্ত, তেমনি ভারী। তফাতের মধ্যে, আমি পুজোর ক’দিন (একদিন ট্রায়াল বাবদ শোভাবাজার থেকে প্রায় ১০-১২ কিমি) হেঁটে মোটামুটি একটা গায়ে-পায়ে সেটা মানিয়ে নিয়েছিলাম। সৌরভ তেমন কিছু করে নি। ফল ফোস্কা এবং সেখান থেকে ভারী ক্ষত। এতদিন হাওয়াই চপ্পলে চলছিল। আজ জুতো পড়েও ভালোই হাঁটছিল। কিন্তু যত বেলা গড়ায়, পিছিয়ে পড়ে। ওদিকে আকাশে কালো মেঘ ঘনায়। ভক্তি আর বাহাদুরকে অনেক আগেই এগিয়ে দেওয়া হয়েছে টেন্টের জায়গা খোঁজার জন্যে।
যেখানে বসে সৌরভ জুতো খুলে চপ্পলে ফেরে, সেখানে জঙ্গল নেই। পাহাড়ের অল্প ঢালে কিছু ঝোপ-ঝাড় মাত্র। ফোঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়। দু-পা যেতেই দেখি ভক্তিরা তাঁবু করে ফেলেছে। ডাকাডাকি করে। আমরাও বৃষ্টি নামার আগেই তাঁবুতে ঢুকে পড়ি। প্রচন্ড বৃষ্টি হয় সারা রাতভোর। সকালে বৃষ্টি থামলেও দেখি আকাশ তেমনি কালো হয়ে আছে।        
পথ চলা শুরু হয়। জুনিপার ঝোপের মাঝ দিয়ে হাল্কা চড়াই। মেঘলা দিনে ভালোই লাগে হাঁটতে। হঠাত সেই নির্বান্ধব পুরীতে সামনে দেখি একটা চায়ের দোকান। জমাটি আড্ডা চলছে সেখানে পোর্টারদের। কিন্তু কাল আকাশ আমাদের দাঁড়াতে দেয় না। টুপ-টাপ জল ঝরে পড়ে গাছের ডাল-পাতার ফাঁক দিয়ে। কিছুটা এগিয়ে একটা পুকুর। তার পাশে দাঁড়িয়ে স্যাকগুলো প্ল্যাস্টিকে জড়িয়ে নিই। তাল পেড়িয়ে বিস্তীর্ন জুনিপার প্রান্তরে দেখি বেশ কিছু সমাধি। বিদেশী মানুষগুলো ধৌলাগিরিতে প্রান হারিয়েছেন। জায়গার নাম পুছর। অনেকে ইটালি ক্যাম্পও বলেন।
এগিয়ে যাই। ধ্বসের মধ্যে দিয়ে নেমে যাই ধৌলাগিরির পশ্চিম গা বেয়ে নেমে আসা একটা ছোট্ট হিমবাহের ধারে। এই হিমবাহের ওপারে ওঠার মাঝেই মিয়াগদি খোলাকে শেষবার পেড়িয়ে যাব। ক্রিভাসের মধ্যে দিয়ে পথ খুঁজে বা পায়ের ছাপ দেখে চলতে হয়। হিমবাহের শেষাশেষি হঠাতই শুরু হয় বৃষ্টি। কালো মেঘ নেমে আসে নীচে। তার সঙ্গে তীব্র ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপটা। হিমবাহের পরের পথ ঝুরোমাটির সংকীর্ন জুতোর ছাপ মাত্র। ডানদিকের ঢালটা সোজা মিয়াগদিতে নেমে গেছে। তার অন্য পাড়ে ধৌলাগিরির পশ্চিম দেয়াল সটান দাঁড়িয়ে।
ঝড়ের তাড়নাতেই বোধ করি সে পথও কখন কোন ভাবে শেষ হয়। একটু এগিয়েই দেখি এক পাথরের ছাউনির নীচে (আচ্ছা বেশ গুহাই বলি) ভক্তি প্রসাদ আর ধন বাহাদুর বসে আছে। আমরা সেখানেই থেকে গেলাম। মুস্কিল হোলো কাছে পিঠে জল না থাকায়। ঝড়-জলের মধ্যেই বাহাদুরকে নিয়ে জল আনতে গেলাম আধ ঘন্টা দুরের মূল ক্যাম্প সাইট ‘পাকোবন’ থেকে। কদিন টানা তাঁবু জীবনের পরে গুহামানবের ভূমিকা সবারই বেশ পছন্দ হয়। গুহার মুখে হাওয়া আটকাতে একটা প্ল্যাস্টিক সিটও ঝুলে যায়।
।।৬।।
এবারের গন্তব্য বহু কাঙ্ক্ষিত ধৌলাগিরি বেস ক্যাম্প। পাকোবন থেকে বেস ক্যাম্পের পথের পাঁচ ভাগের এক ভাগ প্রান্তীয় গ্রাবরেখার (মোরেন) উপলখন্ড সংকুল, আর বাকি চার ভাগ গিয়েছে সরাসরি চোনবারদন হিমবাহের মাঝ দিয়ে। অর্থাত, দক্ষ পথ প্রদর্শক ছাড়া পথ খুঁজে চলা কষ্টসাধ্য। তার চেয়েও বেশি করে সময়সাপেক্ষ। আর পাহাড়ে সময়ের মূল্য সে তো সর্বজ্ঞাত। মুস্কিল হল এই গুহাবাসের রাত্রে জানা গেল আমাদের দুই সঙ্গীর কেউই এই পথ চেনা তো দুর, আগে আসেও নি। ভক্তি বেস ক্যাম্পে এসেছে বটে কিন্তু সেটা উল্টো পথে, যেদিকে আমরা নামবো। তাহলে উপায়?
আগেই বলেছি, আমাদের বহুদিনের (সেই সিবাং থেকে) সঙ্গী বিদেশী দলটার সঙ্গে ছিল চারজন পথপ্রদর্শক শেরপা। দলে সব মিলিয়ে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ জন। আগের দু’দিন আরো একটা বড়ো বিদেশী দলও যোগ দিয়েছে এ’ পথ চলায়। তবে এ’দিন দুটো দলই আমাদের অনেকটা সামনে পাকোবনে শিবির পেতেছিল। কাজেই ঠিক হল, সকাল সকাল বেড়িয়ে ওই দল দুটোকেই পেড়িয়ে যেতে হবে যাতে ওদের চলার পথই আমাদের পথ হয়ে ওঠে। আমাদের হিসাবে পথের দুরত্ব সাত ঘন্টার মতো। কাজেই সূর্য ওঠার আগেই শুধু গরম পানীয় আর শুকনো কিছু খাবার খেয়ে পথে নামলাম।
কিছুক্ষনেই পাকোবন টপকে দ্রুত পায়ে নেমে গেলাম মিয়াগদির তীরে। এবার হাঁটা মিয়াগদির ধারে পড়ে থাকা বড়ো বড়ো পাথরের ওপর দিয়ে। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে অতি সন্তর্পনে পথ চলতে হচ্ছে। কিন্তু লাফ ঝাঁপ করে আর কতো সতর্ক থাকা যায়? মাঝে মধ্যেই পাথরের ওপরে জমা হাল্কা বরফ আস্তরনে (ভারগ্লাস) পা হড়কায়, পাথরের খোঁচা লাগে হাতে। তার মধ্যেই হিমজলের ঝর্না পেরোতে হয় ক’টা। হঠাত থমকে দাঁড়াই। চোখ তুলে দেখি সার দিয়ে ধৌলাগিরি ৬ (৭২৬৮ মি), ৪ (৭৬৬১ মি) আর ৫ (৭৬১৮ মি) শিখরগুলো। সবই কম বেশি সাত-সাড়ে সাত হাজার মিটার উঁচু। সূর্যের আলো পড়ে ঝলমল করে ওঠে।
একসময় পাথুরে পথটা শেষ হয়। ডাইনে বাঁক নিয়ে উঠে পড়ি প্রসস্ত হিমবাহের ওপর। পাথর দিয়ে ঘেরা অস্থায়ী হেলিপ্যাড। আরেকটু এগোতেই ডানদিকে ঝকমকিয়ে ওঠে ধৌলাগিরির মূল শৃঙ্গ (৮১৬৭ মি), নাক বরাবর তুকুচে (৬৮৩৭ মি) আর বামে সীতা চুরচুরা (৫৬১১ মি), ধৌলাগিরি ২ (৭৭৫১ মি) ও ৩ (৭৭১৫ মি) শৃঙ্গ। রোদ ঝলমলে দিন পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় এক নিমেষে। ঝোলা থেকে শুকনো খাবার বেড়োয়। তারপর আবার শুরু হয় হাঁটা। হিমবাহের মধ্য দিয়ে ফাঁক ফোকর এড়িয়ে পথ চলা। পথের কোথাও বা ওপরের পাতলা সাদা বরফ গলে গিয়ে বের হয়ে পড়েছে কালো শক্ত বরফ। পিছল এই বরফের উপর সতর্ক পা ফেলে এগিয়ে চলি।
কিন্তু সৌরভ কেবলই পিছিয়ে পড়ে। পায়ের ক্ষতটায় লাগছে। উচ্চতাজনিত শ্বাসকষ্টও ভোগাচ্ছে কিছুটা। নষ্ট হচ্ছে অমূল্য সময়। পিছনে মিয়াগদির গিরিখাদ ধরে উঠে আসছে কালো মেঘের দল। শেষ পর্যন্ত ধন বাহাদুর ওর স্যাকটা নিয়ে নেয়। তা’ও গতি বাড়ে না। আমরা অধৈর্য হয়ে পড়ি। মেঘের দল এসে পড়ে। জর্মন দলের ভারবাহকেরাও প্রায় সবাই এগিয়ে যায় আমাদের পিছনে ফেলে। বরফ পড়া শুরু হয় অল্প-স্বল্প। পথ বেশ দুরূহ। বরফ গলে কিছু কিছু জায়গা বিপজ্জনকও। সেরকমই এক জায়গায় দেখি অনেকটা ফিল্মি হিরোদের পোজে দুই বরফ চাঙড়ের ফাটলের ওপর দাঁড়িয়ে সবাইকে ক্রিভাস পাড় করাচ্ছে এক শেরপা। আমাদেরও পাড় করে দেয় হাত ধরে। হঠাতই যেন অনেকটা জোর পাই মনে। লম্বা পায়ে এগিয়ে যেতে থাকি। কিন্তু সৌরভ আর চলতে চায় না। শেষে অলোকদাকে বলি এগিয়ে গিয়ে তাঁবু ফেলতে। আমি সৌরভকে নিয়ে চলি। কখনো অনুনয় করে, কখনো ধমকে, কখনো বা সোজাসুজি ধাক্কা মেরে। আবহাওয়া হঠাত সদয় হয়। বরফ পড়া থামে। শেষ বিকেলে বেস ক্যাম্পে (৪৭৫০ মি/ ১৫৫৮৪ ফুট) যখন পৌঁছই তখন আমাদের তাঁবুও তৈরি। সূর্যাস্তের আলো নেচে বেড়ায় হিমচুড়াগুলোতে।

।।৭।।
বাবিয়াচৌর থেকে টানা ৭ দিন হাঁটার পর অবশেষে বিশ্রাম। আলু পরোটা খাওয়া হয় ভরপেট। অলোকদা আর আমি ধৌলাগিরি শিখর অভিযাত্রীদের ক্যাম্পের দিকে এগোই গুটি-গুটি। পথেই তিন অভিযাত্রীর সঙ্গে দেখা। একজন সপ্তাহখানেক আগেই ধৌলাগিরি শৃঙ্গে আরোহন করেছেন। চেকোশ্লভাকিয়ার মানুষ। নাম ববি। এখন ঘরে ফেরার পালা। আমাদের ওঠার পথ ধরে নেমে যাবেন। অভিযানের মালপত্র নামানোর জন্য ভারবাহকেরা আসবে তাই বাকিরা তখনো বেস ক্যাম্পে। বোঝা গেল এ’বারের মতো (পোস্ট মনসুন) শৃঙ্গ অভিযানে ইতি। অলোকদা এগোয় ক্যাম্পের দিকে। আমি ফিরে আসি। রাত্রি ঘনালে তাঁবুর বাইরে এসে অবাক হয়ে দেখি আকাশ জোড়া লক্ষ তারার সামিয়ানা। আর তাদের আলোয় দীপ্ত চরাচর।  
পরের দিন সেই চেক অভিযান শিবিরের পাশ দিয়েই এগিয়ে চলি ফ্রেঞ্চ পাস বা ফ্রেঞ্চ কলের (৫৩৬০ মি/ ১৭৫৮৫ ফুট) দিকে। কিছু পরে চোনবারদন হিমবাহ শেষ হয়। আবার শুরু হয় পাথরের মধ্য দিয়ে পথ চলা। পথের চিহ্ন বলতে পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে তৈরি কেয়ার্নগুলো। একসময় সেই পথও আর নজরে আসে না। ইতি উতি খোঁজাখুঁজিতে যে পথ পাওয়া যায়, তা’ এক কঠিন চড়াই পাহাড়ের গা বেয়ে ধ্বসের মধ্যে দিয়ে। অতো উচ্চতায় হাঁফ ধরে যায়। উঠে আসি পাহাড়ের মাথায়। ধৌলাগিরি পিছনে একটু দূর থেকে যেন আরো রাজকীয়। তার ডানদিকে তকুচে শৃঙ্গ, বাঁয়ে সীতা চুরচুরা।
হাল্কা চড়াই ধরে এগিয়ে চলি। পথ এখন বরফ ঢাকা। এক জায়গায় গিয়ে বাঁ দিকে নেমে যেতে হয়। ফের ওঠা শুরু হয়। আবহাওয়া পরিস্কার কিন্তু প্রচন্ড ঠান্ডা। শুকনো ঝোড়ো হাওয়ায় হাঁ করে শ্বাস নিতে গেলেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। আজকেও অলোকদারা এগিয়ে গেছে। আমি হাঁটছি সৌরভের সঙ্গে। হঠাত এক সময় মনে হয় বারবার দাঁড়ালে জমেই যাব বুঝি। সৌরভকে আসতে বলে দ্রুত পায়ে সামনের পাহাড়ের মাথায় চড়তেই চমকে উঠি। কে যেন চোখের সামনে স্বর্গের দরজা খুলে দেয়। সামনে মুকুট হিমাল, ডাইনে ঝকমক করছে তাশি কাং আর পায়ের তলার বরফ রাজ্য পেড়িয়ে বিস্তীর্ন নদী উপত্যকা। এই ফ্রেঞ্চ পাস বা ফ্রেঞ্চ কল। অলোকদা দাঁড়িয়েছিল কলের ওপর চোরতেনটার পাশে। আনন্দে গলা জড়িয়ে নেচে উঠি। তারপর গলা ভিজিয়ে প্রান বাঁচাই।  
গায়ে ওঠে ফেদার জ্যাকেট। তবু সৌরভ উঠে আসার পর বেশি সময় আর দাঁড়ানো যায় না পাসের মাথায়। হুড়মুড়িয়ে নেমে আসি নরম বরফ উতরাই দিয়ে উপত্যকায়। প্রানের আনন্দে পথও চলা তখন কতই সহজ। অবশ্য পথও খুবই সহজ এক উতরাই। ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই পৌঁছে যাই হিডেন ভ্যালি। আন্দাজ ষোলো হাজার ফিট উচ্চতায় এ’ এক অদ্ভুত উপত্যকা। ঘাসে ঢাকা বিশাল সমতল।  যাকে গোল করে ঘিরে আছে মুকুট হিমাল, তাসি কাং, থাপা বা ধাম্পাস শৃঙ্গ (৬০১২ মি) আর তুকুচে শৃঙ্গ এবং আরো অনেক নাম না জানা বরফমোড়া পাহাড়চুড়া। কোনো অজ্ঞাত কারনে বরফ না থাকলেও রাতের তাপমাত্রা হিডেন ভ্যালিতেও জলকে বরফ করতে ছাড়ে না। তার সঙ্গে সারাক্ষণ বয়ে যায় তীব্র শীতল সে হাওয়া।
।।৮।।
সকাল হয়। সৌরভ তো খানিক অসুস্থই, আমাদেরকেও আলসেমিতে পায়। হাঁটা শুরু করতে প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। আজকেই শেষ চড়াই ভাঙ্গা। উঠতে হবে থাপা পাসের (৫২৫০ মি/ ১৭২২৪ ফুট) মাথায়। তারপর পুরোটাই উতরাই। পথের বিবরন জানায় সে পথের প্রথম এক ঘন্টা বরফের মধ্য দিয়ে, পরের তিন ঘন্টা পাহাড়ের গায়ে জুনিপার ঝোপের মধ্য দিয়ে নেমে যাওয়া তুকুচের পথে ইয়াক খারকায়। পাঁচ সাড়ে পাঁচ ঘন্টার এই সহজ (বিশেষত আগের কদিনের তুলনায়) পথ চলার হিসেবও একটা কারন ছিল আলসেমির। কিন্ত বাস্তব সব সময় হিসাবের খাতায় আঁটে না। আর, পাহাড় হাঁটায় দেরিতে শুরু খাটে না।
ঘন্টাখানেকের সহজ চড়াই পথে থাপা পাস পৌঁছই। ফুটবল মাঠের মাপে প্রসস্ত গিরিপথের সামনে আরেক অলৌকিক দৃশ্যমালা। নীলগিরির নয়নাভিরাম নরম নীল সৌন্দর্য চোখে যেন মধুর মায়া মাখিয়ে দেয়। শেষবারের মতো ফিরে দেখি হিডেন ভ্যালী। তারপর এগিয়ে চলা বরফের পথ ধরে। কিন্তু একের জায়গায় দু’ ঘন্টা কেটে গেলেও বরফ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখি না। বরং ক্রমশঃ আলগা বরফের পরিমান বাড়তে থাকে। এক জায়গায় গিয়ে পথ দু’ ভাগ হয়ে যায়। ওপরে গেলে মারফার পথ, নিচে তুকুচের। পাশে স্কি ক্যাম্প চলছে একটা। আমরা দাঁড়িয়ে যাই। অনেকটা পেছিয়ে পড়া সৌরভের অপেক্ষায়। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর সৌরভ এসে পৌঁছয়। আর প্রায় একই সময়ে নিচের থেকে উঠে  আসে কালো মেঘ।
হড়মুড়িয়ে নামা শুরু হয় আলগা বরফের মধ্যে দিয়ে। শুরু হয় বরফ পড়া। অলোকদা পাল্লা দেয় ভক্তি আর বাহাদুরের সঙ্গে। আমি সৌরভকে তাড়া দিতে থাকি। ভয় হয় নতুন বরফ যদি বরফের ওপর পায়ে চলা পথরেখা মুছে দেয়! প্রতি পদক্ষেপে প্রায় কোমর পর্যন্ত বরফে ডুবে যাচ্ছে। যদিও আমরা নামছি এবং ততক্ষনে খুব খারাপ হিসেবেও চোদ্দ হাজার ফুটের তলায় নেমে এসেছি, তবুও। প্রতি পদে আসংকায় থাকি হাঁটু বা গোড়ালির চোটের। অন্ধকার হয়ে আসে ক্রমে। এক জায়গায় এসে সৌরভকে ছেড়ে দুপদাপিয়ে আধা পায়ে-আধা গায়ে নামতে থাকি। হঠাতই ওপর থেকে চিতকার শুনি, একটা পাহাড়ী ছেলে কিছু বলছে। বুঝতে পারি না। চলতে থাকি। অল্প সময়েই ছেলেটি চলে আসে আমার পাশে। বেশ পরিস্কার ইংরাজিতেই বলে, ওপরে তোমার বন্ধু একা হাঁটছে, তুমি নেমে যাচ্ছ কেন? আমি জানাই, আরো তিনজন আছে আমাদের। তাদেরকে গিয়ে জানাতে চাইছি। আর এই পথে অতো আস্তে হাঁটার ধৈর্যও আর ছিল না আমার। ছেলেটি জানায় ইয়াক খারকা কাছেই। পথও দেখিয়ে দেয়। । সত্যিই পনেরো মিনিটের মধ্যে বরফ ছেড়ে এক ছোট্ট খরকা অঞ্চলে নেমে আসি। বরফ পড়া অবশ্য থামে না। নীচ থেকে অলোকদার বাঁশির শব্দ ভেসে আসে।   
আমি সৌরভের জন্যে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকি। ছেলেটির সঙ্গে আলাপ জমাই। ইয়াক খরকারই ছেলে ও’। নাম শের বাহাদুর বাঙ্গাসি। সৌরভও এসে যায় এক সময়। শের বাহাদুরকে বিদায় জানিয়ে টুকটুক করে তাঁবুতে পৌঁছই। জুতো আর প্যান্ট ভিজে ঢোল। খুলে ফেলি সেগুলো। একপ্রস্থ গরম পানীয় খাওয়া হয়ে যায়। ঝড়ের দাপট বাড়ে। বাড়ে বরফ পড়া। তাঁবুর পোল আঁকড়ে বসে থাকতে হয়। তবু মনের মধ্যে কেমন এক শ্রান্তি ছেয়ে আসে। সৌরভকে দেখে বোঝা যায় ও’ অনেকটা সুস্থ। সন্ধে হলে ঝড় থামে। রাতের মেনু হয় ঘি-ভাত। আজই শেষ টেন্ট। কালকে চলার শেষে তুকুচেতে ভক্তি, ধন বাহাদুরকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমাদের পরের কটা রাত কাটবে হোটেলের শয্যায়।
।।৯।।
পরেরদিন গিরিপথ ধরে হাঁটা জারি থাকে। সকালে একটু সময় যায় জুতোগুলোকে রোদে শুকিয়ে পায়ের মাপে আনতে। কিন্তু হাঁটতে গিয়ে বুঝি সমস্যা আরো জটিল। দু’পা ভর্তি বরফের ফোস্কাগুলো শক্ত হয়ে যাওয়া জুতোর মধ্যে আর্তনাদ করতে থাকে প্রতি পদে। বারবার দলের সবার থেকে পেছিয়ে পড়ি। বিশ্রামের সময় কমিয়ে চলতে থাকি। ঘন্টাখানেক চলার পরে এক বাঁকে এসে সামনে অনেক অনেক নিচে দেখা যায় কালিগন্ডকি নদী আর তার অববাহিকায় তুকুচে গ্রাম। যদিও উতরাই ভাঙ্গা শুরু হয় আরো দু’ ঘন্টা পরে। সকালে বেড়োনোর সময় প্রায় কিছুই খাওয়া হয় নি। পথে চমরি গাইয়ের দুধ খাওয়া হয় এক খরকায়। পাহাড় টপকাতে টপকাতে কালিগন্ডকি অববাহিকার ওপরে আসতেই শুরু আরেক ঝোড়ো হাওয়ার পালা। নীলগিরি তখন হাত বাড়ানো দুরত্বে। বাঁয়ে কালিগন্ডকির বিস্তীর্ন অববাহিকায় দেখা যায় মারফা আর জমসম জনপদ। এমনকি জমসমের বিমানক্ষেত্র। তারও ওপারে মুক্তিনাথের পথ। মুস্তাঙের পথ। ডাইনে বহু নীচে তুকুচে। তার গায়ের থেকে উঠে গেছে তুকুচে শৃঙ্গের পূর্বগাত্র। পিছন ফিরলে এখনো দেখা যায় থাপা শৃঙ্গ। প্রান ভরে দেখি হাওয়ার দাপট সামলে। তারপর শ্রু হয় অন্তহীন উতরাই।
তুকুচে গ্রামের শুরু থেকেই নজরে আসে আপেল গাছের ভীড়। ওরা বলে ‘সিয়াও’। ভক্তির একজন চেনা মানুষ আমাদের সকলকে খাওয়ায় সে রসসিক্ত ফল। মনে হয় যেন অমৃত। যে হোটেলে উঠি সেখানে খাবার দাম দেখে চোখ কপালে ওঠে। খেতেও হয় অবশ্য। খাওয়া শেষে ভক্তিরা বিদায় নেয়। মন ভারী হয়ে আসে সকলের। যাবার সময় আপেল দিয়ে যায় আমাদের হাতে। অনেক দিন পর জল ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে একটু করে পরিস্কার হয়ে নিই সকলেই। রাতে নরম বিছানায় গা এলিয়ে স্বপ্ন দেখি কষ্টের পাহাড় পথেরই।
এর পরের সাড়ে তিনদিনের হাঁটা রাজপথে হাঁটার তুল্য। তার ওপর দীপাবলির উতসবে পথের সজ্জাও ছিল অপরূপ। যদিও প্রায় পুরো পথটাই জুতোদের অসহযোগীতায় হাওয়াই চপ্পল পড়ে হেঁটে পায়ের তলায় ব্যাথাটা ভালোই হয়েছিল। মাঝে সূর্যগ্রহনের দিন (কোলকাতায় হীরের আংটি) তাতোপানিতে উষ্ণ প্রস্রবনে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে সামান্য (অলোকদার মতে রীতিমতো) অসুস্থ হয়ে পড়ি আমি। সেদিনটা বিশ্রাম নিতে হয়। তবে তার পরের দেড় দিন পুরো দমে হেঁটে নেমে আসি বেনি হয়ে বাগলুং। প্রদক্ষিণ সম্পূর্ন হয়।
সেখান থেকে বাসে পোখরা। ঠিক কুড়ি দিন পরে পোখরা পৌঁছলাম। চব্বিশ ঘন্টায় যার যেমন কেনা কাটা সেরে, পরেরদিন আবার বাস। এবার গন্তব্য কাঁকড়ভিটা। ঘন্টা তিনেক পর বাস মুংলিং-এ ঢোকার ঠিক আগে অন্ধকারে ধারাখোলার সেতু পার হল, দেবীপক্ষের দ্বাদশীর রাতে এই ধারাখোলাকেই দেখেছিলাম চাঁদের ওড়না গায়ে জড়িয়ে বলছে স্বাগতম। আজ যাবার দিনে বিষন্ন অন্ধকার দেখি তার মুখ! চোখ বুজে বাসের সিটে শরীর এলিয়ে দিই। আরো চল্লিশ ঘন্টা বাসের সিটেই কাটিয়ে রবিবার উনত্রিশে অক্টোবর বেলা সাড়ে এগারোটায় ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরটা বাড়ি পৌঁছয়। মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও, কোন দুর পাহাড়ের দুর্গম পথের ওঠানামায়।

গতে বাঁধা ভ্রমণকাহিনীর ভ্রমকথা শেষ হয়। শেষ হয় না ভ্রমণের প্রতি পদে গড়ে ওঠা সম্পর্কগুলোর। অনেক কিছু বলেও, বলা হয় না বেশিটাই। তবু মনে পড়ে জঙ্গল পথে আমারই পায়ের শব্দে চমকে ওঠা ভীতা মা মহিষীর চোখের সে প্রশ্ন, ‘তোমরা কেন গো এখানে?’    

 (রচনাঃ ৪ঠা নভেম্বর ১৯৯৫/ সন্ধ্যা)  

1 comment:

Unknown said...

Enjoyed the writing. Excellent !